Samhati
৩:০৮ পিএম
০১ জুন ২০১৪

তারুণ্য, সমাজ ও রাজনীতি

ফিরোজ আহমেদ

তরুণরা আর রাজনীতি সচেতন নন, দেশ-দুনিয়া নিয়ে তারা আর তেমন ভাবেন না, এমন অভিযোগের খামতি নেই।

ঐতিহাসিক নানান কারণেই বাংলাদেশে অধিকাংশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে থেকেছেন তরুণরা, বিশেষ করে শিক্ষার্থী তরুণরা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ’৬৯ এবং ’৭১ পার হয়ে ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানেও তাদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পরবর্তী সময়টিতে রাজনীতি নিয়ে তরুণদের আগ্রহ দেখা যায়নি, এমনটা বহু পর্যবেক্ষণেই এসেছে বারংবার।

কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল ১৯৯০ সালে কিংবা ওই দশকে? একক কোনো ঘটনা, নাকি অজস্র ঘটনার লদ্ধিবল সবার অগোচরে কাজ করে গেছে?

নব্বইয়ের দশকের শুরুটাই ছিল বিশ্বব্যাপী মানুষের মনস্তত্ত্বে আদর্শিক পতনের যুগ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন প্রগতিশীল আন্দোলনকে যেভাবে অস্তিত্ব ধরে আমূল ঝাঁকুনি দিয়েছে, তার ধাক্কা সামলানো দুনিয়াজুড়েই সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের কর্মী হিসেবেও দেখতাম, প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর জোট গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের মিছিলে উপস্থিতির সংখ্যা প্রতিদিন কমে যাচ্ছে। আকৃতিতে গোনার মতো অবস্থা তাদের অনেকেরই ছিল বটে, কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে কমে যাওয়াটাও দৃশ্যমান ছিল। তখনো আশির দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতৃত্ব আর কর্মীদের একটা অংশ টিকে ছিল তাদের, কিন্তু নতুন কর্মী সরবরাহের অভাবে সংগঠনগুলো অচলাবস্থার শিকার হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যে শুধু রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে হতাশার রাজত্ব সৃষ্টি করেছিল, তা কিন্তু নয়। বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তো বটেই, রাজনীতি থেকে দূরবর্তী বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিরাও অনেক ক্ষেত্রে এই আদর্শিক পতনের আঁচ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেননি। ব্যক্তির চেয়ে বৃহত্তর, উচ্চতর আর মহত্তর কোনো কিছুর অনুপস্থিতির একটা বোধ তৈরি করেছিল গণমনস্তত্ত্বে। এদের অনেকেই বহুদিনের জন্য হতাশাগ্রস্ত হয়েছেন, অনেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছেন, মাদকাসক্তও হয়েছেন অনেকে। কিন্তু শুধু হতাশা আর দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়াটাই যথেষ্ট ছিল না, তার জন্য আদর্শিক একটি বাতাবরণও দরকার ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরবর্তী ‘লিসনিং টু দ্য উইন্ড অব চেঞ্জ’ যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনন্ত বিকাশের, অফুরন্ত সমৃদ্ধি আর পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, নব্বই-পরবর্তী তরুণদের বড় অংশ বিশ্বাস করেই সেই স্বপ্নে নিজেদের চালিত করেছিল। নব্বইয়ের দশকে তাই ফ র মাহমুদ হাসান নামের অধুনা বিস্মৃতপ্রায় গণসাহায্য সংস্থার মালিক ছিলেন অন্যতম জাতীয় ব্যক্তিত্ব, পশ্চিম থেকে আনা তার অর্থের ঢলে গা ভেজাননি, টাকা দিয়ে কেনা যায় এমন কোনো বুদ্ধিজীবী ছিলেন না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যখন হয়েই গেছে, অগত্যা রাজনৈতিক দলমুক্ত সিভিল সমাজ আন্দোলনে তার মতো কাণ্ডারিদের ডাকে তরুণদের অনেকেই আস্থা রেখেছিলেন। নতুন বিশ্বাসটা সুবিধাজনকও ছিল, কেননা তাতে সংগঠন করার মতো সময়-শ্রম-মেধা বিনিয়োগ করতে হয় না। অর্থোপার্জন হয়, অথচ সমাজ বদলাবে, এমন ভরসাও পাওয়া যায়। ফ র মাহমুদ হাসান যেমন ছিলেন কৃতি সংগঠক, অজস্র উদ্যমী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীকে তিনি দেশজুড়ে সংগঠিত করেছিলেন তার সিভিল সমাজের আন্দোলনে, তেমনি প্রধানত নব্বইয়ে উদিত আরেকজন কৃতি-লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল নিয়মিত বিরতিতে লিখে চলতেন ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার উপযোগিতা বিষয়ে। এবং প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময়টিতে অর্থনীতিতে মুহাম্মদ ইউনূস উপর্যুপরি বঞ্চিত হওয়ার বেদনায় তিনি পত্রিকায় স্তম্ভ রচনা করতেন। সনাতনধারার প্রগতিশীল আন্দোলনের ‘ব্যর্থতার’ প্রতি ইউনূস আর তার গ্রামীণ ব্যাংকও ছিল গুরুতর একটা প্রতীক। ‘বিপ্লব যদি বিরিয়ানি হয়, সেটার আশায় বসে থেকে আমরা কি পান্তা-ভাতও খাব না?’ পার্টি বনাম এনজিও-জাতীয় যেসব মেঠো বিতর্ক হতো, তাতে এমন প্রশ্ন আসত সদ্য ইমান বদলানোদের দিক থেকেও। প্রত্যুত্তরেও তাহমিদ ভাইয়ের দৃঢ়তা, ‘কিন্তু সেই পান্তা যদি হয় বিষমিশ্রিত? তা যদি আমাদের বিপ্লবের স্বপ্ন ভুলিয়ে দেয়?’ প্রথমজন বোঝাই যায়, দ্রুতই এনজিও কর্তা হয়েছেন, দ্বিতীয়জনও রাজনীতি কার্যকরভাবে ধরে রাখতে পারেননি।
নব্বইয়ের দশক ছিল একটা মিশ্র স্রোত। ষাট থেকে আশির দশকের মাঝে বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্তের রুচি-নৈতিকতা-ধরন-ধারণের অনেক প্রভাব তার মাঝে যেমন বেশ খানিকটা টিকে ছিল, তেমনি আশির দশকেই বিশ্বব্যাপী বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে চালু কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বা স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রামের বদৌলতে ‘হঠাত্ সচ্ছলরা’ আর একজন-দুজন নয়, একটা বর্গ হিসেবেই আবির্ভূত হতে থাকল সমাজে, এই নব্বইয়েই। বেসরকারি নতুন শিল্প, সেবা ও আর্থিক খাতে কাজ করা পয়সাদার মধ্যবিত্ত চমকে দিল এর আগে প্রধানত সরকারি চাকরি আর জমিজমার ওপর নির্ভরশীল ‘শান্তনিস্তরঙ্গ’ সনাতনী মধ্যবিত্তকে। আসবাব-পরিবহন-জীবনযাত্রায় হঠাত্ বিপুল ফারাক সবাইকে বাধ্য করল যে কোনো উপায়ে আরো সম্পদ আহরণে নামতে। এর আগে এমনকি সংবাদকর্মীদের বেতনও বলার মতো কিছু নয়, নব্বইয়ের দশক যাওয়ামাত্র গণমাধ্যমকর্মীদের গড় আয় উল্লেখ করার মতো বেড়েছে। তাদের শিক্ষানবিশ বেতন নামিদামি পত্রিকায়ও ছিল হাজার তিনেক, এখন তা ১৬ থেকে ২০ হাজার, উঠতি তরুণের সচ্ছল জীবনের জন্য একরকম চলনসই। ব্যাংক এবং বেসরকারি অন্যান্য খাতে চাকরির আয় বেড়েছে বহুগুণ। সম্পদের প্রতিযোগিতা সমাজের যে ভারসাম্যটি ধ্বংস করেছে, তার পরিণামে সমষ্টিকে নিয়ে ভাবার সুযোগ গেছে কমে। নব্বই-পরবর্তী তরুণদের একটা বড় অংশ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে তাই মন দিয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠায়।

রাজনীতি বিযুক্ত কি শুধু তরুণ শিক্ষার্থীরাই হয়েছেন? আশির দশকেও আহমদ শরীফ কিংবা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীরা ছিলেন শিক্ষকদের শিরোমণি। গণবিরোধী, জাতীয় স্বার্থবিরোধী অজস্র ঘটনায় তাদের নেতৃত্বে শিক্ষকসমাজ, বুদ্ধিজীবীরা রুখে দাঁড়িয়েছে। তাদের যুগ অবসানের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় নানান ঘটনায় মতামত গঠন, বুদ্ধিজীবীসুলভ নেতৃত্ব প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সামান্যই ভূমিকা রাখছে। বরং শিক্ষকদেরও আরো বড় একটা অংশকে আগেরকার কনসালট্যান্সি, প্রজেক্ট ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি দেখা গেল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠতে। পুরনো শিক্ষকরা বিদায় নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক চেতনা গঠন করার মতো প্রভাবশালী শিক্ষকও বিরল হয়ে পড়ল।
আশির দশক পর্যন্ত দেশব্যাপী পুরনো বামপন্থী আন্দোলনের সহগামী একটা শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলনও ছিল। খেলাঘর, উদীচী, কচি-কাঁচার আসর ইত্যাদি নাম এখনকার কিশোর-তরুণদের কাছে খুবই অচেনা হলেও অধিকাংশেরই মফস্বলে বেশ গোছানো তত্পরতা ছিল। খেলাধুলা-নাটক-গান, আবৃত্তি চর্চা শুধু নয়, বার্ষিক নানান উত্সব আর আয়োজনে সরগরম ছিল এই পাড়া। ছিল গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন। সোভিয়েত ভর্তুকিতে বইয়ের প্রকাশ এ দেশের মধ্যবিত্তকে কতটা প্রভাবিত করেছিল, আশির দশকের বইপড়ুয়াদের জিজ্ঞাসা করলেই তা টের পাওয়া যায়। নব্বইয়েও এর সামান্য কিছুটা ছিল। প্রগতিশীলতার নিজস্ব একটা গণ্ডি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনও। সোভিয়েত ইউনিয়ন উধাও হওয়ামাত্র এদের হারিয়ে যাওয়া কিছুটা প্রমাণ করে— এদের প্রাণভোমরা যথেষ্ট পরিপুষ্ট ছিল না। ঠিক এ মুহূর্তের অর্থনীতিবিদ, চিকিত্সক, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারক, শিল্পবোদ্ধা, ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদদের একটা বড় অংশ, যাকে বলা যায় দেশের শাসক ও সংস্কৃতিবান রুচির ননীস্বরূপ অংশটিও এই ঘরানায়ই পুষ্ট হয়েছেন, বৃত্তি নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠ থেকে শুরু করে সোভিয়েত ভর্তুকিতে ‘উদয়ন’ পত্রিকার গ্রাহক হওয়া পর্যন্ত কোনো না কোনো মাত্রায়।

এমনকি আশির দশক পর্যন্ত শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জোশটা টিকে ছিল। পাটকল কিংবা চটকলের শ্রমিকদের আয় এবং গড় জীবনমান এখনকার অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষের চেয়ে ভালো ছিল। এ শ্রমিকদের রাজনৈতিক চেতনার একটা প্রভাব সমাজে ভালোভাবেই ছিল, তাদের সন্তানরাও উচ্চশিক্ষার যথেষ্টই সুযোগ পেতেন। অন্যদিকে এই রাষ্ট্রীয় শিল্প শাসকদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে লাভজনক ছিল না, কিন্তু বন্ধ করে দিতে পারলে নানান লুটপাটের সম্ভাবনা ছিল। অথচ চাইলেই কারখানা বন্ধও করে দেয়া যাচ্ছে না, বাধা সংগঠিত শ্রমিক। শ্রমিক আন্দোলনকে তাই দ্রুতই দুর্বৃত্তায়ণ করা হচ্ছিল রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে আর অর্থায়নে। রাজনীতির প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ আশির দশকেই আদমজীসহ নানান রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পক্ষেত্রে সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড, মাদক আর অস্ত্রবাজি। এর প্রয়োজন পড়েছিল কারখানাগুলো বন্ধের অজুহাত সৃষ্টিতে। অবশেষে সেগুলোর বৃহদাংশ বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে বন্ধ হয়, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে পঞ্চাশ-ষাটের দশক থেকে গড়ে ওঠা শিল্পভিত্তিরও অবসান ঘটে। সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর অনুপস্থিতি এবং মাফিয়া ত্রাসে পরিণত হওয়া শ্রমিক আন্দোলনের স্মৃতি যৌথভাবে সামাজিক ভাবমানসে রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
আশির দশক এমনকি নব্বইয়ের দশকের তুলনায়ও এখন শিক্ষাঙ্গনগুলোয় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে। কারণ স্বৈরতন্ত্রী আমলের মতো সবাই মিলে লুটের পণ্যের ভাগবাটোয়ারা নয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সবকিছুতে কায়েম হয়েছে একক দখলদারিত্ব। আজকে ছাত্রদল-ছাত্রলীগের সংঘর্ষ বিরল বরং খুনোখুনি হয় একই সংগঠনের বিবদমান অংশের মধ্যে। এ আধিপত্য এতই একচ্ছত্র যে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সর্বত্র শিক্ষার্থীরা বাস করেন রাজনৈতিক বড় ভাইদের রাজত্বে। সালাম না দেয়ার অপরাধে ছাত্রাবাস থেকে পিটিয়ে বের করে দেয়ার ঘটনা অজস্র আছে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোয়ই। এ বছরই এসএম হলের ৯৭ জন প্রথম বর্ষের ছাত্রকে ১৫ ফেব্রুয়ারির মাঝে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের ‘সনদ’ নিয়ে তবেই হলে ফেরত আসার হুকুম দেয়া হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনী বন্দোবস্তেই যদি দখল কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়, তো আলাদা করে আর ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন কেন? ফলে ডাকসু, চাকসু, জাকসু, রাকসুসমেত দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কোনো নির্বাচনের ধারা নেই দুই যুগের বেশি সময় ধরে।
কিন্তু এই ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্রেফ কিছু প্রতিনিধি নির্বাচন করাই তো নয়। এভাবেই বিকশিত হওয়ার কথা ভবিষ্যত্ রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝেও রাজনৈতিক চেতনা বিস্তৃত হওয়ার কথা। শিক্ষাঙ্গনে তার নিজস্ব দাবিদাওয়া এবং পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে যেমন বিতর্ক হবে এই নির্বাচনে, তেমনি বিতর্ক হওয়ার কথা রাষ্ট্রের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি, খনিজ সম্পদ, শিল্পায়ন, তিস্তার পানি পাওয়া-না পাওয়া, নারীর অধিকার নিয়ে। সাংস্কৃতিক তত্পরতার আখড়া হওয়ার কথা এ সংসদগুলোর। এগুলোকে অকার্যকর করে রাখা তাই একদমই কাকতালীয় নয়। বরং শাসক দলের নিয়ন্ত্রণ পাওয়াটা যেমন হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে, তেমনি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্রের শাসনে রাখাটাও অসম্ভব হবে তেমন পরিস্থিতিতে। বাধ্য না হলে নির্বাচন দেয়াটা লুটেরাদের স্বভাবে নেই। কাজেই ছাত্রসংসদ যেমন নেই, তেমনি নেই সাংস্কৃতিক কোনো আয়োজন, নেই সর্বজনীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝেও নেই কোনো যৌথ অনুশীলন।

এ সবকিছুর বাইরে যা থাকে, তা তো সামাজিকীকরণ হওয়ার যত উপায় আছে, তা যথাসম্ভব বাদ দিয়ে তারুণ্যের যতটুকু বাকি থাকে, ততটুকু। পরিবর্তনের ভাবনা সুদূরপরাহত ঠেকলে তার যৌক্তিকতা উপলব্ধির সব প্রকার সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে শতহাত দূরে ঠেলে দেয়া হলে বাকি থাকে যে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আদিম প্রতিযোগিতা, আমাদের তরুণদের বড় অংশ তাতেই নিয়োজিত। এবং এর জন্য যদি কাউকে দোষারোপ করতে হয়, সেটা এই তরুণদের করা যাবে সবচেয়ে কম।

কেননা এ পরিস্থিতি আজকের তরুণরা সৃষ্টি করেনি। তারা প্রধানত এ পরিস্থিতির শিকার। বরং এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভালো যেটা করা যেত, সেটাই তারা করছেন। আমরা যেটাকে তাদের সচেতন রাজনীতি বিমুখতা বলে ভাবছি, ঘনিষ্ঠতর ভাবনায় সেটিকেই বর্তমান যা কিছু, তার প্রত্যাখ্যান বলেই চেনা যায়। স্বদেশের শিকড়ে পরিপুষ্ট নয়, এমন প্রগতিশীল রাজনীতি জরুরি সময়ে ভেঙেচুরে গেছে, তরুণকে পথ দেখাতে সক্ষম হয়নি। অথবা সময়টা হয়তো বড় বেশিই বিরূপ ছিল, কোনো রাজনীতির সাধ্য ছিল না তার মোকাবেলা করায়। বাকি লুটেরাদের রাজনীতিও চেতনার দিক থেকে গ্রহণ করা তরুণের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
১৯৯০ সালের শেষ দিকেই ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারী ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ও যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। গত দুই দশকে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন ও বেতন ফি বৃদ্ধি-বিরোধী আন্দোলন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধানতম আন্দোলনের বিষয়। প্রগতিশীল রাজনীতিতে নব্বইয়ে অতি দ্রুতগতিতে ক্রমহ্রাসমান কর্মীর তুলনায় খুব ধীরগতিতে হলেও আনাগোনা বেড়েছে পরবর্তী দশকে, এ হার এখন কিছুটা বলার মতো গতিই অর্জন করেছে। বই কেনার হার এর সমানুপাতে বেড়েছে, যদিও আশির দশকের সঙ্গে তুলনায় মাত্রাটি এখনো মর্মান্তিক। কিন্তু নব্বইয়ের তুলনায় তা উল্লেখযোগ্যমাত্রায় বেশি। সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছাত্রসংসদ প্রভৃতির যা করার কথা ছিল, সেই রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির আর মতামত আদান-প্রদানের কাজটি কিছুটা ত্বরান্বিত করেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। রাজনৈতিক বক্তব্য ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতি যে উদাসীনতা ও প্রত্যাখ্যান নব্বইয়ের দশকের উঠতি তরুণের বৈশিষ্ট্য ছিল, তাও আর ততটা কেতাদুরস্ত নেই। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, তাদের বড় অংশটি আজও যৌথতার মাঝে নিজের বিকাশের সম্ভাবনা খুঁজে পায়নি। সেই অর্থে তারা রাজনৈতিকভাবে একা।
তরুণরা প্রত্যাখ্যান করেছে, এটা অবিমিশ্র ইতিবাচক নয়। কেননা অসংগঠিত আর বিচ্ছিন্ন মানুষের প্রতিরোধ অতিসহজে ভেঙে দেয়া যায়। সংগঠন থেকে নিজেদের বেশ খানিকটা গুটিয়ে নিয়েও তারা যে সম্পূর্ণ আত্মকেন্দ্রিক নন, তাদের অহমে ঘা লাগলে তার পরিণতি কী হতে পারে, তা টের পাওয়া গেছে ১/১১-পরবর্তী সংঘর্ষগুলোয়। প্রতারিত হওয়ার বোধে আক্রান্ত হলে তারা যে অযুতে নিযুতে নেমে আসতে জানেন, তার প্রমাণ তারা রেখেছেন যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া সমঝোতার রায়ের বিরুদ্ধে অগণিত সংখ্যায় নেমে এসে। মফস্বলের তরুণদেরই আরেকটা অংশ, নগর যাদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে প্রায় বর্জন কিংবা পরিত্যাগ করেছে; স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক বা শ্রমিক আন্দোলনের অনুপস্থিতি, মাদ্রাসার প্রভাব আর প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক তত্পরতার অভাব তাদেরকে আপাতত হলেও ঠেলে দিয়েছে মৌলবাদী শক্তির পেছনে, তারাও তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। সামনের দিনে যদি শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন গড়ে ওঠে, জাতীয় সম্পদ রক্ষার চেতনা শক্তিশালী হয়, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা আর জাতীয় উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষার বিকাশ ঘটে, নগর কিংবা মফস্বলের সব তরুণ তাতে যুক্ত না হয়ে পারবে না কিংবা উল্টো দিক থেকে সামনের দিনের বাস্তব সংকটগুলোর কারণে তরুণরা এই রাজনৈতিক সংগ্রামগুলো গড়ে না তুলেও পারবে না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিক

লেখাটি দৈনিক বণিক বার্তায় প্রকাশিত