Samhati
২:১৭ পিএম
০১ জুন ২০১৪

মালোপাড়ায় বাংলাদেশ

ফিরোজ আহমেদ

১. বিদ্বেষের তত্ত্বতালাশ
`একটা জিনিস লক্ষ করবেন, ব্রিটিশরা যেটাকে সাম্প্রদায়িকতা বলছে, হিন্দু-মুসলমান বিভেদ বলছে, যার ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলো, সেই জিনিসটা কিন্তু ব্রিটিশ আসার আগে এ দেশে ছিল না।` ব্রাত্য রাইসুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সলিমউল্লা খানের বরাতে পাওয়া অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের এই মতটি গ্রহণ করা কঠিন। সাম্প্রদায়িকতা কিংবা হিন্দু-মুসলমান বিভেদের সামাজিক কারণগুলো ব্রিটিশদের আগমনের আগেই যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। মঙ্গল কাব্যের বহু লেখকই দুই সম্প্রদায়ের সংঘর্ষ সম্পর্কে একটি পরিচ্ছেদ রাখতেন, অন্য সূত্রগুলোতেও এমন নিদর্শন ঢের আছে।

সুলতানি আমলে লিখিত বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলের বর্ণনায় মুসলমান কাজী হিন্দুর আচারাদি পালনে কোনো আপত্তি করেননি। মোল্লা কিন্তু সর্পদেবীর পূজানুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় কাজীকে র্ভৎসনা করেন। কাজী আর মোল্লার মধ্যে ফারাকটি জরুরি, একজন রাজক্ষমতাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, অন্যজন সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছেন। রাজার লক্ষ্য কর আদায়, ক্ষমতার বিকাশ ও স্থায়িত্ব সাধন, তাই প্রয়োজন যথাসম্ভব সাম্প্রদায়িক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। এসবের স্বার্থেই তিনি সাধ্যানুযায়ী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসকে নিরুৎসাহিত করবেন, কিন্তু নিজ ধর্মের লোকদের কাছে `ধার্মিক` সাজারও যথাসম্ভব চেষ্টা করে যাবেন। রাজার বিপদ একদিকে সংখ্যাগুরু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রজাকে ক্ষিপ্ত করতে সাহস না করা, অন্যদিকে তাঁর শেষ ভরসা ও ক্ষমতার ভিত্তি নিজ ধর্মাবলম্বীদের সমর্থন হারানোর আশঙ্কা। সুলতানি আমলপরবর্তী মোগল আমলেও রাষ্ট্রক্ষমতা ও সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করা না করার এই জটিলতার আভাস পাওয়া যাবে ১৬৪০ সালের একটি বিচারের ঘটনার বর্ণনায়, যেখানে আধুনিক মেদেনীপুর জেলায় একজন বাঙালি মুসলিমের বিচার করছিলেন আরেকজন বাঙালি মুসলিম কাজী। অপরাধ ছিল হিন্দুগ্রামে এক জোড়া ময়ুর হত্যা ও ভক্ষণ, কাজী অভিযুক্তকে চাবকানোর হুকুম দিয়ে রায়ের ব্যাখ্যায় বলেন, ৬৬ বছর আগে বঙ্গবিজয়ের সময় সম্রাট আকবর কথা দিয়েছিলেন যে বাঙালিদের তাদের প্রথা আর আইন অনুসরণ করতে দেওয়া হবে। ফলে হিন্দুগ্রামে প্রাণী হত্যা করে মুসলমান প্রজাটি আইন ভঙ্গ করেছে।

কিন্তু রাজনীতি সর্বদা ক্ষমতার বাঁধা নিয়মে চলে না, দাঙ্গাটা হঠাৎ হঠাৎ লাগত। বিপুল সংখ্যাগুরু হলেও রাজক্ষমতারহিত হিন্দু জনগোষ্ঠীই এই দাঙ্গার শিকার হতো এবং তাদের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতো, কবি বিজয়গুপ্তের বর্ণনায়
`যাহার মস্তকে দেখে তুলসীর পাত।
হাতে গলায় বাঁধি লয় কাজির সাক্ষাত।
কক্ষতলে মাথা থুইয়া বজ্র মারে কিল।
পাথর প্রমাণ যেন ঝড়ে পড়ে শিল।
পরের মারিতে পরের কিবা লাগে ব্যথা।`

এই `পর` তো শুধু ব্যক্তিগতভাবেই পর না, তুলসীধারণকারী সম্প্রদায়গত পরও বটে। কিন্তু এর পরও রাজক্ষমতা দাঙ্গা এড়িয়ে চলতে চাইত, চৈতন্যদেবের প্রতি বিদ্বিষ্ট কাজীও মহাসঙ্কীর্তন রুদ্ধ করতে এসে শেষ পর্যন্ত তার প্রেমভাবে মুগ্ধ হয়ে তাকে আলিঙ্গন করেন, এমন বর্ণনাও পাওয়া যাবে চৈতন্যের জীবনীতেই। আবার মোগল সাম্রাজ্যেও একটা প্রকাশ্য সম্প্রীতির ভাব থাকলেও পারিবারিক দ্বন্দ্বে জীর্ণ হওয়ার পর আওরঙ্গজেবের আমলে ধর্মীয় চিহ্নগুলোই যে প্রধান হয়ে উঠল, তার কারণ তার ভিত্তিটা সর্বদাই অস্তিত্বশীল ছিল।

অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মোটামুটি গ্রহণযোগ্য মত হলো, সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণই ছিল, এমনকি হিন্দু-মুসলিম মিলন, পরস্পরের সংস্কৃতি সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও উপভোগের অজস্র দৃষ্টান্তও ইতিহাসে পাওয়া যায়। মমতাজুর রহমান তরফদার ভাষায় `হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সম্পর্ক ছিল আন্তরিকতাপূর্ণ এবং ধর্মান্ধতার ঘটনা ছিল বিরল। যদিও সতর্কতার সঙ্গে এসব গ্রন্থ পড়লে মনে হয় যে কিছু কিছু মুসলমান কর্মকর্তার ব্যক্তিগত খেয়াল ও ধর্মান্ধতা এসব সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের জন্য দায়ী ছিল। আবার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামার ঘটনাও ঘটেছিল` ( হোসেনশাহী বেঙ্গল)। অর্থাৎ প্রাক-ব্রিটিশ আমলে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের তুলনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই প্রধান প্রবণতা ছিল, এই মতটি একভাবে মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু জিনিসটা ব্রিটিশরা আসার আগে এ দেশে ছিল না, এই মতটি মেনে নেওয়ার মতো না।

তার পরও অধ্যাপক রাজ্জাকের বক্তব্যটির সারকথাটুকু গ্রহণ না করে উপায় থাকে না, কেননা আমাদের চেনা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্ম ও বিকাশ ঔপনিবেশিক শাসকদের আশ্রয়ে ও মদদে; হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশের আদিপর্বে আধুনিক সাম্প্রদায়িকতার সূচনা ও তারই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পরবর্তী সময়ে বিকশিত মুসলমান মধ্যবিত্তের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তার রমরমা। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলের শেষ পর্বটি এক রকম সাম্প্রদায়িক সংঘাতেরই ইতিহাসে পরিণত হয়, সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক ব্যবহার পরিণত হয় নৈমিত্তিক চর্চায়।

খ. বিদ্বেষের জের
ফরায়েজি আন্দোলন মুসলমান চাষা সম্প্রদায়ের ভেতর তৈরি হওয়া গোষ্ঠী অনুভূতির একটা বিশিষ্ট উদাহরণ, মর্মগত দিক দিয়ে পূর্ব বাংলার নমশূদ্র চাষাদের মতুয়া ধর্মও তাই। একটি `খাঁটি` ইসলাম কায়েমের ছলে দরিদ্র চাষিদের জমায়েত করেছিল, অন্যটি `ভক্তি` আন্দোলনের ছলে বর্ণহিন্দু গোষ্ঠীর হিন্দুত্বের খাতা থেকে বাতিল হয়ে `চণ্ডাল` তকমা পাওয়া জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করেছিল। একদা প্রভাবশালী এ দুটি ধর্মগোষ্ঠীই আজ কেবল ইতিহাসের বিষয়।

সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীস্বার্থে একাট্টা জমায়েতে আসা মানুষ একই সময়ে ভিন্ন অনুভূতির প্রাবল্যে ভিন্ন নিশানেও জমায়েত হতে পারে। একটা চমৎকার উদাহরণ দেওয়া যাক : `পূর্ববঙ্গের নমশূদ্র কৃষকদের একীভবনের আরো একটি স্তর ছিল। যাঁরা হিন্দুকরণের রাজনীতিতে সাড়া দিচ্ছিলেন, তাঁরাই কিন্তু আবার শ্রেণীভিত্তিক আন্দোলনেও যোগ দিচ্ছিলেন। ১৯৩৭ সালের মাঝামাঝি থেকেই খুলনা, ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ প্রভৃতি জেলায় `কমিউনিস্ট ধাঁচে কৃষক সমতি` গড়ে উঠতে শুরু করে, আর এই জেলাগুলোতে হিন্দু কৃষকদের অধিকাংশই ছিলেন নমশূদ্র` (উন্নয়ন বিভাজন ও জাতি : বাংলায় নমশূদ্র আন্দোলন ১৮৭২-১৯৪৭, শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়)। একই উদহারণটি একই সময়ের মুসলমান চাষাদের জন্যও খাটে, তেভাগা আন্দোলন আর পাকিস্তান আন্দোলন মুসলমান চাষার হৃদয় যেভাবে সাড়া দিয়েছে, খোকা রায়ের স্মৃতিকথায় উদ্ধৃত একটি বাক্যে তার পুরো পরিপ্রেক্ষিতটি পরিষ্কার হয়। ময়মনসিংহের এক মুসলিম লীগ নেতা গিয়াস পাঠান চাষিদের বলছেন : `মিয়া, পাকিস্তান হইলে তেভাগা না, চৌভাগা পাইবা!` এর সরল অর্থ হচ্ছে, হিন্দু জমিদার না থাকলে মুসলমানদের রাজত্বে চৌভাগা, অর্থাৎ মালিকের স্বত্বটাই কৃষকরা পাবে- এই প্রলোভনটাই চাষিদের সামনে হাজির করে দরিদ্র চাষিদের জড়ো করা সম্ভব হয় মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত নেতাদের পেছনে।
চাষার হৃদয়ে একই সাথে শ্রেণীদ্বন্দ্ব আর ধর্মীয় পরিচয়ের ঐক্যের টানাপড়েন ঔপনেবিশক আমলে যেভাবে জারী ছিল, তারই চূড়ান্ত ফল হলো জাতীয়তাবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাছে শ্রেণীর রাজনীতির পর্যুদস্তই না কেবল, অনেকখানি অধীনস্তও হওয়া। কলকাতা থেকে শুরু করে নোয়াখালী পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের রক্তস্নাত দিনগুলো তাই নিয়তির মতোই নেমে এলো।

গ. সাম্প্রদায়িকতার পাটাতন কি উচ্ছেদ হয়েছে
পাকিস্তান আন্দোলনে পূর্ব বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল বাঙালি আশরাফ মুসলমান নেতৃত্ব, আর পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে বাঙালি আতরাফ মুসলমান নেতৃত্ব, রিচার্ড এম. ইটনের মূল্যায়নটি এমনই। কিন্তু এই সারসংক্ষেপের খাঁড়ার নিচে কাটা পড়ে যায় তৎকালীন পূর্ব বাংলারই বাসিন্দা বিশাল হিন্দু জনগোষ্ঠী, সঙ্গে আর সব সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়ও। বদরুদ্দীন উমরের মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কিত আলোচনাতেও এই সীমাবদ্ধতাটি প্রকাশিত; কিন্তু এ কথাও ঠিক যে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার পৃথকতা ও বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন তিনিই প্রথম, এবং সবিস্তারে। কিন্তু যখন তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা নেই, কারণ সাম্প্রদায়িকতার আর্থসামাজিক ভিত্তি নির্মূল হয়ে গেছে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিষয়ে তাঁর যুগান্তকারী আলোচনার পরও এই সারসংকলনটুকু অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী সরলীকরণের দোষে দুষ্ট। হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগত উচ্ছেদের কারণে যদি সাম্প্রদায়িকতার আর্থসামাজিক ভিত্তি উচ্ছেদ হয়েই থাকে (কারণ কেড়ে নেওয়ার মতো আর কোনো সম্পদ বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের নেই, যেটা আছে ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে মুসলমান জনগোষ্ঠীর হাতে এবং সেইটাই সেখানকার সাম্প্রদায়িকতার আর্থসামাজিক ভিত্তি)। এটা তো ভোলার উপায় নেই যে সাম্প্রদায়িকতার `আর্থসামাজিক ভিত্তি` উচ্ছেদের এই প্রক্রিয়াটি ছিল নারকীয় এবং এর নৃশংস রক্তপাতময় স্মৃতি এখনো যৌথস্মৃতিতে দগদগে ঘায়ের মতোই বিকট। এর চেয়ে বড় কথা হলো, সাম্প্রদায়িকতার গভীর সাংস্কৃতিক আবহটি কোনো শিক্ষা-সংস্কৃতিগত সংগ্রাম ব্যতীত, পরমত সহিষ্ণুতার ক্ষেত্র প্রস্তুতি ব্যতীত শুধু অপরের শারীরিক উচ্ছেদ হওয়ার মধ্য দিয়ে কিছুতেই দূরীভূত হয় না।
পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দ্বিজাতিত্ত্বকে অস্বীকার করা, এই বিরোধিতার সারকথা ছিল, ধর্মীয় ঐক্য নয়, বরং ভাষা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস জাতীয়তার ভিত্তি। তার পরও একদম ১৯৭২ সাল থেকে যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার শাসকরা যে সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণে যথেষ্টই আগ্রহী ছিলেন, তার নিদর্শন বহু। একাত্তরপরবর্তী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি যায়নি, এবং খুব দ্রুত ও নিশ্চিত গতিতেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরাজয় ঘটতে থাকে বাংলাদেশে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সামাজিক নিপীড়ন ও চাপ সৃষ্টি করার প্রধান আইনি হাতিয়ার অর্পিত সম্পত্তি আইন বা শত্রু সম্পত্তি আইন দাপটের সঙ্গেই চালু থাকে, রাষ্ট্রের মুসলমানীকরণও ধীরে হলেও অব্যাহত থাকে। এভাবে ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালের তীব্রতম সংগ্রামের পরও নানা ঐতিহাসিক পাকেচক্রে ক্ষমতায় আসীন হয় যে শ্রেণীটি, জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের কোনো কার্যকর কর্মসূচির অভাবে ও লুণ্ঠন তাদের সম্পদ উপার্জনের প্রধান তৎপরতা হওয়ার কারণে আর সব প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর মতোই তারাও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারাকেই বাংলাদেশে স্থাপিত করার চেষ্টা করে।

বরং বলা যায়, পাকিস্তান আমলের যে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পাল্টা বিকাশ ঘটা শুরু করেছিল, জনগণের ভাবমানসের ওপর তার প্রভাবটুকু, ওই ছাপটুকুই বরং সমাজকে কিছুটা সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ মুক্ত করেছিল, রাষ্ট্রকে বাধ্য করেছিল বুলিবাগিশি হলেও অসাম্প্রদায়িক অলঙ্কারে ভূষিত হতে। শাসকদের কিন্তু সর্বদাই চেষ্টা ছিল সাধ্যানুযায়ী জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকে প্রবলতর করার, সেটা শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন না করা থেকে শুরু করে নানা ধর্মীয় আয়োজন নতুন করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে করা থেকে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে। সেই সঙ্গে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি দখল তীব্র আকার নেয়। এরই ধারবাহিকতায় জিয়াউর রহমান এই কাজটিকেই আরো পাকাপোক্তভাবে সম্পন্ন করেন এবং অলঙ্কারটুকুও বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের ধর্মীয় চেহারা সুস্পষ্ট করেন।
সাম্প্রদায়িকতার সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মূল হওয়ার কোনো কারণ বাংলাদেশে ঘটেনি, সংখ্যাল্প সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের হীন দৃষ্টিভঙ্গির কোনো অবসান এখানে হয়নি। এবং এর ফলেই ক্ষমতাসীন কোনো তরফ ভূসম্পত্তি দখল কিংবা উৎখাতের সহজ লক্ষ্য হিসেবে তাকে বেছে নিতে পারে, সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে নারী নির্যাতনও পরিচালনা করতে পারে, যেটি আবার প্রতিপক্ষকে আরো দুর্বল করারই একটা অস্ত্র মাত্র। ধীরগতিতে সম্প্রদায়গত সংখ্যালঘুকে নির্মূল করার একটা শক্তিশালী সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এখানে কার্যকরভাবে জারী রয়েছে।

কিন্তু বিপরীতে এও সত্য যে রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, তার উৎপাদিকা শক্তির অগ্রগতি ও মালিকানা সম্পর্কের বদলের সঙ্গে সঙ্গে আর সব সম্পর্কের মতো সম্প্রদায়গত সম্পর্কও পরিবর্তিত হয়। হিন্দু জমিদারের প্রতি বিদ্বেষের বাস্তব কারণ যখন অনুপস্থিত হয়, বাকি থাকে কেবল পারস্পরিক সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় অসূয়া। সেটাও খানিকটা দুর্বল হয়ে যাওয়ার শর্ত তৈরি হয়েছে গ্রামীণ ও মফস্বলী ভেদরেখা মুছে ফেলা নাগরিক জীবনের বিস্তারে। আভিজাত্য-ধর্ম-সম্প্রদায় ইত্যাদির ভেদ মুছে প্রাত্যহিক লেনদেনের সম্পর্কই প্রবলতর হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। তার পরও সাম্প্রদায়িকতার এই সাংস্কৃতিক অবশেষও খুবই শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কার্যকর আছে। কেননা সহজে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে এমন বিপুল ছিন্নমূল ও রাজনৈতিকভাবে অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষ আছেন, সংখ্যালঘুর সম্পত্তি দখলে আগ্রহী এমন ক্ষমতাবান মধ্যবিত্ত আছেন এবং সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নটিকে ব্যবহার করে ভোট বাগাতে চান এমন রাজনৈতিক নেতাও আছেন।

সাম্প্রদায়িকতা রোখার দায় কার
বাধ্য না হলে রাষ্ট্র সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষায় যে উদ্যোগী হবে না, তা শুধু ক্রমে ক্রমে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভূসম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি আইনের গ্যাঁড়াকলে বেহাত হয়ে যাওয়ায় না, চাকরি-বাকরিতে তার সংখ্যার প্রতিনিধিত্ব ঘটনায় না, বাংলাদেশে হিন্দু নাগরিকের একটা বিশাল অংশ দেশান্তরী হওয়া থেকেও নয়, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে পরিচালিত স্রেফ একতরফা হামলাগুলো প্রতিরোধে সরকার বা প্রশাসনের তেমন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া থেকেও পরিষ্কার। ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলনরত গার্মেন্ট শ্রমিকদের গুলি করতে তার বাধে না, সারের দাবিতে কৃষকের ওপর গুলি করার ঐতিহ্য যেমন এই রাষ্ট্রের আছে, আছে ভিয়েতনামে যুদ্ধের প্রতিবাদে সংহতি মিছিলে গুলি করার কৃতিত্বও, কিন্তু সাম্প্রদায়িক হানাহানি বন্ধে আজ পর্যন্ত আইনের হাতকে উত্তোলিত হতে আমরা দেখিনি কখনো। রাষ্ট্রে নিরাপত্তা আর নাশকতা দমনের নামে কত শত গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট নীতি বাস্তবায়িত হয়, নিত্যনতুন বাহিনী গড়ে তোলা হয়, কিন্তু সাম্প্রদায়িক আক্রমণ বন্ধে তা কবে কোথায় কাজে লেগেছে?

সর্বশেষ নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক হামলাকে সরকারি দল সমর্থকরা তাদের পুরো আলোচনার কেন্দ্রে রাখছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বিএনপি-জামায়াতের হামলা, যদিও যশোরের অভয়নগরের বিজয়ী সরকারদলীয় সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, ওই হামলায় পূর্বতন সংসদ সদস্য ইন্ধন জুগিয়েছেন, যিনি ছিলেন আওয়ামী লীগেরই হুইপ। রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় একই দৃশ্য আমরা দেখেছি, আমরা দেখেছি সাঁথিয়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীটির পাশে প্রধান হামলাকারীদের ভিড়। কিন্তু সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে অনলাইন প্রচারণার প্রায় পুরোটা এবার গরম ছিল প্রথম আলোর কথিত `ছবি জালিয়াতি` নিয়ে। এই প্রপাগাণ্ডার ডামাডোলটা বাজানো হয়েছে একটা ভয়ংকর সত্যকে আড়াল করার জন্য, সেটা এই ঘটনারই অন্য পিঠ। এই হামলা ঠেকানোর দায়িত্ব কার ছিল? কেন থানা থেকে অল্প দূরত্বের রাস্তায় শত শত ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়? টিভিতে তা প্রায় লাইভ দেখানো হয়, অথচ পুলিশ খবর পায় না! কে শপথবদ্ধ ছিল এই মানুষগুলোকে রক্ষায়? কে? কারা?
নির্বাচন কমিশন শপথ নিয়েছিল ভোটারদের রক্ষার ও আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল নাগরিকদের রক্ষা করা। সেটা করতে তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে, এই সত্যটা তারা ভুলিয়ে দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। এই অর্ধসত্যের কারবারিরা সাম্প্রদায়িক হামলার সাংস্কৃতিক পরিবেশটা টিকিয়ে রেখে এর রাজনৈতিক ফলটা হজম করতে চায়, পুরো প্রক্রিয়ার তারা একটামাত্র উইংমাত্র, আর অল্পকিছু সরল বিশ্বাসে সেই ডামাডোলে যোগ দেয়। সাম্প্রদায়িক হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয় না, বিচার হয় না, তদন্তও হয় না, ব্যর্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের শাস্তিও হয় না; কিন্তু সেটাকে ব্যবহার করা হয় নিজেদের টিকে থাকাকে বৈধ করার জন্য। নব্য কিংবা ঝানু আওয়ামী সমর্থকরা কজন সরকারের দায় নিয়ে কথা বলেছেন? প্রায় কেউ-ই না।

সাঈদীর ফাঁসির রায়ের ঘটনায় সাম্প্রদায়িক হামলা পরিচালনা করা হয়েছে গোটা হিন্দু সম্প্রদায়কে রাজনৈতিকভাবে জিম্মি করার জন্য, যুদ্ধাপরাধীর বিচারকে বানচাল করতে নিরপরাধ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা। রামুতে জমির লোভই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। অভয়নগরে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভোট দেওয়ার প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে। উল্টো দিকে রামপালে ভারতীয় পুঁজির সহায়তায় সুন্দরবনধ্বংসী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে যাদের জমি অধিগ্রহণ করছে আওয়ামী লীগ, সেই বসতভিটা-আবাদি জমিহারারা প্রায় সর্বাংশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রকল্পের স্থান নির্বাচনে এই সাম্প্রদায়িক হিসাব-নিকাশ খুব গূরুত্বপূর্ণ, এবং কেবল `নোমো`রাই উচ্ছেদ হবে, কাজেই মুসলমানদের আপত্তি করার কিছু নেই, এমন প্রচার স্থানীয় লীগ নেতারা অকাতরেই চালাচ্ছেন।

বাংলাদেশের লুটেরা রাজনীতির দুটো দিক এ থেকে স্পষ্ট, এই ডাকাতরা কেউ জনসমর্থন আদায় করে ভিন্ন সম্প্রদায়ের ঘড়বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে; কেউ সেই পোড়া ঘরবাড়ি দেখিয়ে নিজের দলে ভোট টানে। ফলে সাম্প্রদায়িকতা বন্ধে বাস্তব আগ্রহ দুই জোটের কারোরই নেই। আইনবিদ ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার ভাষায় : `জামায়াত-শিবির-বিএনপি এলে দেশে অরাজকতা হবে, তাই আগামী ১৫ বছর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে হবে, তবে আমরাও বুঝতে চাই, সেটি তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়েই করতে চায় কি না!`
মালোপাড়ার বাংলাদেশ

অভয়নগরের মালোপাড়ার সবাই জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ। পুরো পাড়ায় নাকি চাকরি করেন মাত্র দুজন, একজন বিমানবাহিনীতে ছোটখাটো একটা পদে, অন্যজন একটা স্থানীয় বিদ্যালয়ে। বিদ্যুৎ নেই, পাশের `মুসলমানপাড়া` থেকে লাইন টেনে আলো জ্বালান। অবিশ্বাস্য হারে তাদের বিল দিতে হয় মূল গ্রাহককে: পাঁচটি বাতির জন্য এক হাজার৮০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা। নিকটতম পাঠশালা তিন কিলোমিটার দূরে। ছোট্ট মালোপাড়াকে এক লহমায় বোঝার জন্য আর খুব বেশি লাগে না, এই মুহূর্তে যে মালোপাড়া আগুনে পোড়া, লুটপাটের শিকার হওয়া এক বিধ্বস্ত আতঙ্কিত জনপদ।

নির্বাচনের দিন সেখানে হামলা একবার না, তিন তিন দফায় ঘটে। প্রথম দুবার তাঁরা প্রতিহত করেছিলেন দুর্বৃত্তচক্রকে। একই সঙ্গে বারংবার আবেদন জানিয়েছেন প্রশাসনের কাছে, তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য। কর্ণপাত করা হয়নি। এলাকাবাসী বরং অভিযোগ করেছেন, ফায়ার ব্রিগেড আর নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক গাড়ি তাঁদের গ্রামের কাছাকাছি এসেও থেমে গেছে, ফিরে গেছে। বৈদ্যুতিক আলোর উৎসটির মালিক সাম্প্রদায়িক সহমর্মিতার বশেই নাকি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন রাতের বেলা শেষবারের হামলার সময়। ফলে প্রতিবার শত্রু আরো বেশি শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে আসায় অন্ধকার সেই রাতে তাঁরা তৃতীয়বারের মতো মোকাবিলার ঝুঁকি নেননি।

কেটে ফালা ফালা করে হয়েছে চাপাতলার টিনের চাল ও বেড়া। দরজা ভেঙে তছনছ করা হয়েছে আসবাব, সিন্দুক ভেঙে লুট করা হয়েছে টাকাপয়সা আর অলঙ্কার। বিশেষ ক্ষোভ ছিল মাছ ধরার জালগুলোর ওপর। ছাই বানিয়ে দেওয়া হয়েছে বইপত্র। নবম শ্রেণীপড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর পোড়া বইপত্রের মধ্যে দেখলাম `শ্রীকৃষ্ণ : তিনি কে ছিলেন, কী তাঁর উপদেশ` নামের একটা সম্পূর্ণ অক্ষত বই।

জামায়াতের ক্যাডাররা যে এই হামলায় প্রধান ভূমিকা রেখেছে, সেটা নিয়ে এলাকাবাসী সংশয় নেই কোনো। কিন্তু শত শত মানুষ আকাশ থেকে এই হামলা চালাতে পারে না, তাদের সংগঠিত হতে হয়েছে, দলবদ্ধভাবে চাপাতলার মালোপাড়ায় আসতে হয়েছে। তাদের হাতে ছিল দা, বোমা আর রেললাইনের পাথর ভর্তি সিমেন্টের ব্যাগ- এগুলো তারা ছুড়ে মেরে আহত করেছে নদীপথে পলায়নপর মানুষজনকে।
কিন্তু প্রশাসন কেন নীরব ছিল? কেন তারা আক্রান্ত মানুষজনকে সাহায্য করতে যায়নি? ভোটকেন্দ্র রক্ষা করছিল তারা! গণতন্ত্র রক্ষা করছিল তারা! প্রশ্নের এই উত্তর। সাম্প্রদায়িক হামলাকে পুঁজি করে রাজনীতির ফায়দা হাসিল করা চলছে ষোলআনা, কিন্তু আক্রান্ত মানুষগুলোকে রক্ষা করতে তৎপরতা দেখানোর একটামাত্র নিদর্শনও নেই। এলাকাবাসী কারো নাম প্রকাশে আগ্রহী নন, যদিও অনেকেই তাঁদের `মুখচেনা`।
এই আতঙ্কের কারণ সহজেই অনুমেয়। জামায়াত হোক, বিএনপি হোক, আওয়ামী লীগেরই কেউ হোক, মালোপাড়ার মানুষ তাঁদের হিংস্র প্রতিবেশীকে চটাতে চান না। ফলে প্রতিবারই আরো কিছু মানুষ ভিটেমাটি ছাড়া হন, কেউ কেউ হয়তো গঞ্জনাময় এই মাতৃভূমির মায়াই ত্যাগ করেন। বাকিরা বাধ্য হন সাংস্কৃতিক একটা অভিযোজনে, নিত্য অপমান-নিরাপত্তাহীনতা আর অধিকারহীনতায় টিকে থাকার কায়দা রপ্ত করে ফেলেন।

সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির একটা পাটাতন শক্তিশালীভাবে কায়েম আছে বলেই সরকার হোক, বিরোধী দল হোক, প্রতিবেশী হোক, ভূমিদস্যু হোক, প্রশাসন হোক, সবাই ধর্মীয় পরিচয়কে এত সহজে ব্যবহার করার সুযোগটি নিতে পারে। মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার কলুষ থেকে মুক্ত করার চেষ্টাটা জরুরি, কিন্তু সেই সাংস্কৃতিক পরিবর্তনটা না ঘটে যাওয়ার আগে কি আমাদের কিছু করার নেই? একটা দাবি এই মুহূর্তে তাই হওয়া উচিত সাম্প্রদায়িকতাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে আইন প্রণয়ন, যেখানে সাধারণ অপরাধ থেকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা, সংস্কৃতি, আচরণকে চিহ্নিত করা যাবে। প্রয়োজন একটি স্থায়ী সংস্থার, যারা সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও বিষবাষ্প নিরসনে কাজ করবে, সাম্প্রদায়িক আইনকানুনকে চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক আর সব ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করা। প্রয়োজন যেকোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা রোধে ব্যর্থতার দায়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা, আরো প্রয়োজন এ যাবত ঘটে যাওয়া সব সাম্প্রদায়িক হামলার তদন্ত ও বিচার। সেটা করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে হামলাকারীরা যেমন সাহস হারাবে, তেমনি প্রশাসনও তৎপর থাকবে আক্রান্ত মানুষকে রক্ষায়।

ক্ষমতার স্বার্থে উচ্চস্তর থেকে ঘটানো হামলা হোক আর স্থানীয় পর্যায়ের সাম্প্রদায়িক দুরভিসন্ধি হোক, কোনো ক্ষেত্রেই জনগণের দুর্বলতর অংশকে রক্ষায় রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান হয় না। আমাদের সমাজে আপাতসংঘবদ্ধ অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করা, মাঠের লড়াইয়ে নামাই রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত হতে বাধ্য করার পথ। সে রকমের একটি সংঘবদ্ধ প্রয়াস এই মুহূর্তের দাবি, যারা যেকোনো সাম্প্রদায়িক হামলার সময় অনতিবিলম্বে ঘটনাস্থলে হাজির হবে, প্রতিহত করবে, ঘটনার তদন্ত করবে, জনগণের সামনে তার পর্যালোচনা হাজির করবে; এমন একটি সংঘ, যার অস্তিত্ব ও কর্মকাণ্ডই যেমন একাধারে রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ হতে বাধ্য করবে, জনগণের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চেতনাকেও শক্তিশালী করবে, যূথবদ্ধ করবে। রাষ্ট্রের কাছ থেকে কার্যকর কিছু তখনই আশা করা যায়, যখন বিচার আদায়ের মতো শক্তিও ফরিয়াদি অর্জন করে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিক

লেখাটি দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত