Samhati
২:২৩ পিএম
০১ জুন ২০১৪

বাংলাদেশে গণতন্ত্র উত্তরণের পথ

আবুল হাসান রুবেল

বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সদ্যই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এবং নতুন সরকার গঠিত হলো। এই নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল অনেক কম, অর্ধেকের বেশিসংখ্যক আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। তার চেয়ে বড় কথা, বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে কার্যকর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার তেমন সুযোগও ছিল না। ফলে এই নির্বাচনে জনগণের পছন্দমতো প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সাধারণভাবে যে স্থিতি ও নিশ্চয়তার বোধ তৈরি হয়, তাও এবার অনুপস্থিত। নবগঠিত সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকাও এক ধরনের গোঁজামিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে সরকারে আছে আবার বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করতে চাইছে। বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় `নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের` মাধ্যমে গঠিত হয়ে অর্ন্তবর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবে, না পূর্ণ মেয়াদেই অধিষ্ঠিত থাকবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তাতে অনেক বিদেশি পত্রপত্রিকাই `একদলীয় শাসন`, `কর্তৃত্ববাদী শাসনের` পূর্বাভাস দিচ্ছে। আমরা আশা করতে চাইব, এ সংকটও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। কর্তৃত্ববাদী শাসনের ধারাবাহিকতা নয়, বরং একটা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের স্বপ্নই আমরা বাংলাদেশের জন্য দেখি। সে ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে হবে দেশের সামগ্রিক মঙ্গলের প্রশ্ন বিবেচনায় রেখে। নির্মোহভাবে গণতন্ত্রের প্রকৃত বাধাবিপত্তি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলার মাধ্যমে। সেই প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখেই এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ নিবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে।

কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য চাই সক্ষম স্বাধীন প্রতিষ্ঠান

সংসদীয় গণতন্ত্রে সব কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু তথা প্রাণ হওয়ার কথা জাতীয় সংসদের। জাতীয় সংসদ যে বাংলাদেশে কার্যকর নয়, সেটাও বহুল আলোচিত। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে বিরোধীদলীয় সদস্যদের বর্জন কিংবা ভাষার ব্যবহার। কিন্তু সরকারি দলের সদস্যদেরও সংসদে উপস্থিতি তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

অর্থাৎ সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে উপস্থিত থেকে তাঁদের মতামত বা স্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করার কাজটি করছেন না। সেটা সরকারি দল, বিরোধী দল নির্বিশেষে সবার জন্যই সত্য। কিন্তু সংসদ সদস্যরা কেন সংসদে উপস্থিতির প্রয়োজন বোধ করছেন না? বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের একটা কারণ হলো, সংসদে তাদের সংখ্যানুপাত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে না পারা। এখানে গত দুটি (অষ্টম ও নবম) সংসদের ইতিহাস বলে, মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে আসনসংখ্যায় তাদের ভেতরে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তৈরি হতে পারে। এতে বিরোধীরা সংসদের ভেতরের চেয়ে বাইরেই তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনুভব করে। ফলে তারা সংসদে উপস্থিত থাকার চেয়ে রাজপথেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাহলে সরকারি দলের সদস্যদের সংসদে অনুপস্থিত থাকার কারণ কী? এ প্রশ্ন আলোচনা করতে গেলে উল্লেখ করতে হয় সংবিধানের ৭০ (১) অনুচ্ছেদের কথা, যেখানে বলা হয়েছে : `কোনো নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহাদের আসন শূন্য হইবে।` এ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় ভোটদানে বিরত থাকাকেও দলের বিপক্ষে ভোটদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ৭০ (২) অনুচ্ছেদে এ ক্ষেত্রে সংসদীয় নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করলে তার আসন শূন্য হওয়া নিশ্চিত করা হয়েছে।

ফলে কার্যত সংসদ নেতা যা বলেন, তার বিরুদ্ধে যাওয়ার রাস্তা সাংবিধানিকভাবেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা নিজেদের স্বাধীন ভোটাধিকার হারিয়েছেন। ফলে তাঁদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি তেমন কোনো হেরফের ঘটায় না। ফলে এমনকি সরকারি দলের সদস্যদেরও সংসদে উপস্থিত হওয়ার তেমন কোনো তাগিদ তৈরি হয় না। এর সঙ্গে যদি যুক্ত করেন যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যেমন বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি সংসদে আলোচিত হওয়ার কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। তাহলে পিঠ চাপড়ানি, তোষামোদ আর গালিগালাজ ছাড়া সংসদের আর কিইবা করার থাকে! অথচ কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য কার্যকর সংসদের কোনো বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে সংসদকে কার্যকর করতে গেলে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে, সংসদকে সব নীতি প্রণয়নের কেন্দ্রবিন্দু করতে হবে। আসন সংখ্যায় ভোটের অনুপাতের প্রতিফলন থাকতে হবে।

সংসদকে যেমন এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে, তেমনিভাবে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও। বাংলাদেশের সংবিধনের ৫৫ ধারা অনুযায়ী সব নির্বাহী ক্ষমতা যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে অর্পণ করা হয়েছে এবং তিনি একাধারে যেভাবে সংসদনেত্রী, প্রধানমন্ত্রী, দলীয়প্রধান, রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ক্ষমতার অধিকারী, তা তাঁকে সর্বময় কর্তৃত্ব দান করেছে।

সংবিধানিকভাবে এখানে ক্ষমতা পৃথকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়নি। ফলে সরকারের প্রধান ব্যক্তির একক ক্ষমতার বাইরে প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব তৈরি হতে পারেনি। জনগণের কল্যাণ বা রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের চেয়ে একক ক্ষমতাধর ব্যক্তির বা তার অনুগ্রহ প্রাপ্তদের তুষ্টিই হয়ে দাঁড়িয়েছে তার উদ্দেশ্য। কেননা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ইত্যাদি হয়ে উঠেছে বিশেষ ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর ইচ্ছাধীন। রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় বা জনগণের কল্যাণে তার নিবেদন, যোগ্যতা ইত্যাদি তার উন্নতি বা অবনতির মাপকাঠি হতে পারেনি। ফলে প্রতিষ্ঠান তার প্রাতিষ্ঠানিকতা হারিয়েছে। একটা সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে সংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে একক ক্ষমতা বাতিল করে ক্ষমতার প্রয়োজনীয় পৃথকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই হবে কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রথম পদক্ষেপ।

লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতি ও সর্বব্যাপী দখলদারির অবসান দরকার

বাংলাদেশ সম্পর্কে ইদানীং বিদেশি পত্রপত্রিকায় `উইনার টেকস অল` (বিজয়ীর দখলে সব কিছু) বাক্যাংশটি বেশ চালু হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে আমরা বহু দিন থেকেই সর্বময় লুণ্ঠন ও দখলদারি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বলে আসছিলাম। এই বাক্যাংশটি বাংলাদেশের ক্ষমতার সঙ্গে সর্বময় দখলদারি ও লুণ্ঠনের অধিকার লাভের যোগসূত্রটা বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত এই লুণ্ঠন ও দখলদারির ক্রমবৃদ্ধি ঘটেছে এবং এমনভাবে তা শেকড় গেড়েছে যে তাকেই এখন স্বাভাবিক বলে ভ্রম হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের হলফনামায় সম্পদ বৃদ্ধির যে হার দেখানো হয়েছে, তাতে অনেকেই নড়েচড়ে বসেছেন। তবে তাঁদের প্রদর্শিত সম্পদ যে প্রকৃত সম্পদের একটি অংশমাত্র- সাধারণ্যে সেটাই ধারণা। এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও এ অবস্থার অবসানের কোনো লক্ষণ নেই। বরং বর্তমানে বিরোধী দল ও সরকারি দল হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিরল কৃতিত্বের অধিকারী জাতীয় পার্টির সরকারের অংশীদার হওয়ার দাবির ভেতরে লুণ্ঠনের ভাগিদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষার উদগ্র প্রকাশ ঘটেছে। জাতীয় পার্টির সরকারে অংশ নেওয়ার আবদারটা অদ্ভুত- এবার যেহেতু তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, তাই তাদের পুরস্কার হিসেবে মন্ত্রিত্ব দিতে হবে। যেন কারো হয়ে কাজ করে দেওয়ার জন্য তারা ইনাম চাইছে এবং সেই ইনামের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যবদলের নিশ্চয়তা তৈরি করছে। অন্যরা যেটা রেখেঢেকে প্রকাশ করে, জাতীয় পার্টি তা বলে দিয়েছে সোজাসুজি। ফলে রাষ্ট্রক্ষমতাকে লুণ্ঠন ও সম্পদ বৃদ্ধির কাজে লাগানোর ধারাকেই অব্যাহত থাকার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। আর রাষ্ট্রক্ষমতাকে লুণ্ঠনের কাজে লাগানোর সঙ্গেই সম্পর্কিত একচেটিয়া দখলদারি। এই একচোটিয়া দখলদারি কিংবা বিজয়ীর সব কিছু দখলের রীতি আসলে জুয়ার নীতি। একটা গণতান্ত্রিক সমাজের রীতি কিছুতেই এটা হতে পারে না। এই একচেটিয়া দখলদারি রীতি আর একটি অংশকে এই একচেটিয়া ক্ষমতার অংশীদার করে নিজেকে একচেটিয়াভাবে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে দুর্নীতির বিস্তার ঘটায় এবং কালক্রমে দুর্নীতি-লুণ্ঠনই প্রধান, প্রায় একমাত্র তৎপরতা হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থা দেশের একটি সত্যিকার উৎপাদনশীল অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দেশের একটা সত্যিকার উৎপাদনশীল বিকাশ দাবি করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। সেখানে লুণ্ঠনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পুরনো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা তার পুরনো ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায়। এই দ্বন্দ্বে দেশের উৎপাদনশীল বিকাশ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটা লুণ্ঠন-দুর্নীতির ওপর ভিত্তি করা রাষ্ট্রও উৎপাদনপ্রক্রিয়া ছাড়া যেমন টিকতে পারে না, তেমনি উৎপাদনী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে লুণ্ঠন-দুর্নীতি থাকে। কিন্তু কোনটি প্রাধান্যে থাকবে, তা নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের মাধ্যমেই। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে আমরা যদি একটা উৎপাদনশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চাই, তাহলে লুণ্ঠন-দুর্নীতি বন্ধে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন শক্তিশালী করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে করতে হবে স্বাধীন, শক্তিশালী ও সংসদের মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। তার স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সদস্যদের হাতে দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও সরকারি হিসাবে নিরীক্ষণের জন্য ক্ষমতা অর্পণ করা যেতে পারে।

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের অনুশীলন ছাড়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই কার্যকর হবে না

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা দেখি দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটের ভেতরে পরস্পরের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। এটা শুধু গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে বেমানানই নয়, বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক সংস্কৃতি ও সৌজন্যবোধেরও বিপরীত। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ কোনো গোত্রভিত্তিক সমাজ নয়, যেখানে পরস্পর যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। বরং এটা একটা কৃষিভিত্তিক দেশ, পরস্পর নির্ভরশীলতা ও সাধারণ সম্প্রীতি তার সামাজিক বৈশিষ্ট্য। ফলে এই প্রবল সহিংস, মুখ দেখাদেখি বন্ধ, পরস্পর উচ্ছেদের সংকল্পবদ্ধ বিরোধিতার ব্যাপারটি নতুন আমদানি এবং এক অর্থে কৃত্রিম। স্বাভাবিক উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক তৎপরতা থেকে সরে গিয়ে লুণ্ঠনকেন্দ্রিক গোষ্ঠীক্ষমতা প্রতিষ্ঠাই এর কারণ। এই লুণ্ঠনকেন্দ্রিক গোষ্ঠীক্ষমতা যে একচেটিয়াতন্ত্রের জম্ম দিয়েছে, তা সব সময়ই চায় বিরতিহীন ও ভাগিদারবিহীন লুণ্ঠনের একচেটিয়া সুযোগ। এই গোষ্ঠীক্ষমতার প্রয়োজনেই একটা পরস্পর বিনাশে উদ্যত প্রবল প্রতিপক্ষ আকারে টিকিয়ে রাখা হয়েছে এই দুই পক্ষকে। কিন্তু কার্যত তারা একই আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত। একই ধরনের ক্ষমতার প্রতিভূ। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে, অর্থনেতিক নীতির ক্ষেত্রে, সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। পার্থক্য কেবল কিছু ঝোঁকে এবং সেই পার্থক্য প্রধানত সাংস্কৃতিক। কিন্তু এই ছোট পার্থক্যকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে তুলে এমন অসহনশীল পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ দারুণ হুমকির মুখে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেভাবে পরস্পরকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, ইসলামবিরোধী, অন্য দেশের চর ইত্যাদি অভিধায় চিহ্নিত করেছে, তা গণতান্ত্রিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার বিপরীত। এগুলো আসলে করা হয় বল প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধিতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অজুহাত হিসেবে। এই প্রক্রিয়া সত্যিকার অর্থেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন গোষ্ঠীক্ষমতার অংশীদারদের বাইরেও একটা অংশ বিশেষত বিদ্ব্যৎসমাজের মাধ্যমে যখন তা সমর্থিত হয়। কেননা তখন তা সমাজে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। একটা লুণ্ঠনমূলক গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ক্ষমতার এটা সঙ্গী হলেও একটা উৎপাদনমুখী, স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে এ ধরনের বিদ্বেষ ও অসহনশীলতার সম্পর্ক সরাসরি সাংঘর্ষিক। কাজেই গণতান্ত্রিক ধারার প্রতিষ্ঠা চাইলে পরস্পরকে রাষ্ট্রবিরোধী, ধর্মবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে চিহ্নিত করার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। জাতীয় অর্জনগুলোকে রক্ষা করা, তার তাৎপর্য বাস্তবায়িত করার বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিরোধী পক্ষকে একটি স্বীকৃত বিরোধী দল হিসেবে তার সব গণতান্ত্রিক অধিকারের নিশ্চয়তা না দিয়ে বল প্রয়োগ করলে তা যেমন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, তেমনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির তেমন কোনো প্রসার ঘটবে না। বিরোধীদেরও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের সীমা অতিক্রম করে সহিংসতা সৃষ্টির পথ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সর্বোচ্চ সহনশীলতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার পথে যেতে হবে।

গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্থায়ী ব্যবস্থা

বর্তমানে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয়েছে তা জনগণের সম্মতিকে নিজের শাসনের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের ভাষ্যমতে, এটা `নিয়মরক্ষার নির্বাচন বা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা` রাখার নির্বাচন ছিল। সে ক্ষেত্রে এই সরকারের জনগণের সম্মতি ব্যতিরেকেই পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সমীচীন হবে না। আর পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে গেলে সরকারকে পরিপূর্ণভাবে বল প্রয়োগের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং তা দেশে একটি শাসনাতীত অরাজক পরিস্থিতি বা কর্তৃত্ববাদী শাসন সৃষ্টি করতে পারে। ফলে উচিত হবে অবিলম্বে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটা নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রশ্নটি তুলে রেখে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত সেই পথকেও আর গ্রহণযোগ্য রাখে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। দেশের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার অন্য সব প্রয়োজন উপেক্ষা করে কেবল নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য রাখার প্রয়োজনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্ভব। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা ও তার প্রয়োজনে সর্বত্র দলীয়করণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও গ্রাস করেছে এবং সর্বশেষে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতায় পুরো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বাতিল করা হয়েছে। এ অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় সমগ্র ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণ ছাড়া শুধু নির্বাচনী ব্যবস্থার বদল এমনকি নির্বাচনী ব্যবস্থাকেও অচিরেই গ্রাস করে। ফলে সংকটের সমাধানসূত্র কেবল নির্বাচনী ব্যবস্থার বদলেই নেই, আছে গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করতে অন্যান্য ব্যবস্থার বদলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থার বদলকে বিবেচনা করা।

এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।

* নির্বাচনকালীন সরকারবিষয়ক বিতর্কের অবসান হওয়া দরকার প্রথমেই। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকেই নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বর্তমান কাঠামো ও ক্ষমতা অনুযায়ী গঠিত নির্বাচন কমিশন দিয়ে তা হবে না। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে স্বাধীন, সক্ষম ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য এবং নির্বাচনকালীন সময়ে সরকার পরিচালনার সব ক্ষমতা তার ওপর ন্যস্ত করতে হবে।

* একটি সাংবিধানিক অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হবে এবং সংসদের অনুমোদনক্রমে তা কার্যকর হবে। এই অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হবেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবং সর্বশেষ সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সেখানে প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

* এই উপায়ে গঠিত নির্বাচন কমিশনকে নিজস্ব প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেওয়ার পূর্ণ কর্তৃত্ব দিতে হবে। জাতীয় সংসদে তাদের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল, স্থগিত কোনো আসনের নির্বাচনের ফলাফল বাতিল বা স্থগিতের ক্ষমতা ভোগ করবে।

* নির্বাচনকালীন সময়ের সরকার হিসেবে সমগ্র প্রশাসন কমিশনের কর্তৃত্বের ভেতরে থাকবে। তারা দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করবে এবং নীতিগত বা নতুন উন্নয়নের কাজের সিদ্ধান্ত নেবে না।

* রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনীতিকে লুণ্ঠনের উপায় বিবেচনায় তার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবে নির্বাচনকে টাকার খেলা বানানোর প্রক্রিয়ার অবসান করতে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ব্যক্তিগত প্রচার পদ্ধতি বাতিল করে নির্বাচন কমিশনের অধীনে সবার সমান প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যেক দল কেন্দ্রীয়ভাবে নিজস্ব প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারবে। তবে তারও স্বচ্ছতা ও ব্যয়সীমা নির্ধারিত হবে। যুদ্ধাপরাধী ও লুটেরাদের নির্বাচিত হওয়ার অধিকার রহিত করতে হবে।

* বর্তমানে সামান্য ভোটের ব্যবধানে বিপুল বিজয় বা পরাজয়ের যে ব্যবস্থা আছে, তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে। এর বদল ভোটের অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব চালুর ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশের জনগণ এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশ স্বাধীন করেছে তার রক্তের ঋণ এখনো শোধ হয়নি। সত্যিকার সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী, জনগণের সমস্যা সমাধানে সক্ষম যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, তা প্রতিষ্ঠার দায় আজ আমাদের সবার কাঁধে। এই দায় পূরণের অঙ্গীকারই আমাদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গঠনের রাজনীতি তৈরি করবে। কালের এই ডাক যাঁরা শুনতে পাবেন না, তাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীত হয়ে যাবেন। এই দেশ আর তার জনগণের আত্মত্যাগ, শ্রম আর নিষ্ঠা এক মানবিক, সম্প্রীতিপূর্ণ আর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরে। এই দাবি পূরণের দায় আমাদের সবার।

লেখক: প্রাবন্ধিক, রাজনীতিক ও পরিবেশ সংগঠক

লেখাটি দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত