Samhati
৬:১৩ পিএম
০১ জুন ২০১৪

বাংলাদেশে অভিন্ন নদীর বাঁচা-মরা

আবুল হাসান রুবেল

একটা জীবন্ত প্রাকৃতিক সত্তা হিসেবে নদীর একটা নিজস্ব শুরু ও শেষ আছে। আছে তার নিজস্ব জীবনচক্র। কখনো নদী প্রমত্তা যৌবনা, উচ্ছ্বল, কখনো শান্ত। কখনো কখনো প্রাকৃতিক কারণেই সে দিক বদলায়, এমনকি প্রাকৃতিক কারণে তার মৃত্যুও হতে পারে। বাংলাদেশের নদীগুলোর ক্ষেত্রে ১৭৮৪ সালে বিশাল ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্র তার গতিপথ পরিবর্তন করে বর্তমানে নতুন খাতে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়। তিস্তা পদ্মা ছেড়ে যমুনায় মিলিত হয়। এক সময়ের প্রবল করতোয়া তিস্তার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ১৭৮৭ সালে এক প্রবল বন্যায় এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে করতোয়া খর্বকায় নদীতে পরিণত হয়। এগুলো সবই প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু এ রকম বড় বড় প্রাকৃতিক ঘটনা ছাড়াও নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে, তার ধারা ক্ষীণ হয়ে আসে। সেগুলো ঘটে শত শত বছর ধরে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ৭০০ থেকে ২২৫টিতে নেমে আসা, কিংবা বেশির ভাগ নদীরই প্রবাহ হারিয়ে ফেলার কারণ মোটেই প্রাকৃতিক নয়। এর কারণ অপরিণামদর্শী উন্নয়ননীতি, নদী লুট, দখল। আর বাংলাদেশের বড় নদীগুলোর কোনোটিরই উৎস বাংলাদেশে নয়। সেগুলো একাধিক দেশে প্রবাহিত অভিন্ন নদী। এ রকম অভিন্ন ৫৭টি নদীর ৫৪টিই এসেছে ভারত থেকে। ফলে এ ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারক, ভারত এসব নদীর প্রায় সব কয়টি থেকেই তাদের ইচ্ছামতো পানি প্রত্যাহার করছে, নদীতে নানা স্থাপনা নির্মাণ করছে বাংলাদেশকে অবহিত না করেই। আর এত অভিন্ন নদীর ভেতরে কেবল একটির ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ পানি বণ্টন চুক্তি করতে পেরেছে। সেটা গঙ্গায় ফারাক্কা ব্যারেজের স্বীকৃতি দিয়ে। অথচ এই ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের পদ্মা আজ মৃতপ্রায়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গও রেহাই পায়নি এর কুপ্রভাব থেকে।

দুনিয়াজুড়েই নদীর বারোটা বাজানো প্রকল্পগুলোর ভেতরে বড় বড় বাঁধ নির্মাণই আছে এক নম্বরে। অথচ একেই বলা হয়েছে উন্নয়নের চিহ্ন। জওহরলাল নেহরুর ভাষায় `আধুনিক ভারতের মন্দির।` ভারত পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণকারী দেশ। প্রায় পাঁচ হাজার বড় বড় বাঁধ ভারতে নদীগুলোর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁধের ফলে খোদ ভারতেই উদ্বাস্তু হয়েছে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ। কিন্তু এই বাঁধ নির্মাণ প্রক্রিয়া এখনো থেমে নেই, আরো নতুন নতুন বাঁধ নির্মাণের কাজে অগ্রসর হচ্ছে ভারত। এসব বাঁধের ফলে বাংলাদেশে প্রবেশকারী অধিকাংশ নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নদীর মৃত্যু ঘটেছে। নদীতে ভারতের সবচেয়ে আগ্রাসী পরিকল্পনা হলো আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প, যা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। ভারত এই প্রকল্প ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন করছে কি না সে বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই প্রকল্প ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ভারত সরকার তা স্বীকার করছে না। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ হবে বাংলাদেশের একটা বিরাট অংশের নদীর পানিশূন্য হয়ে পড়া এবং ফলে গোটা বাংলাদেশের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হওয়া।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলে ভারতের আধিপত্যমূলক ভূমিকার মতোই নদী বিষয়ে ভারতের প্রকল্প একই সঙ্গে নদী তথা প্রকৃতির ওপর আধিপত্য ও জবরদখলি ভোগের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত। ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প গ্রহণের গোড়ায় যে দৃষ্টিভঙ্গি তা হলো, নদী স্বাদু পানির অনন্ত আধার। আর তার প্রতিটি ফোঁটাকে কাজে লাগাতে হবে। তাকে সমুদ্রে পড়ে `অপচয়` হতে দেওয়া যাবে না। সে কারণে যেখানে অধিক পানি আছে সেখান থেকে খরাপ্রবণ এলাকায় পানি টেনে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু নদীকে `সমুদ্রে পড়ে অপচয় হওয়া থেকে রক্ষা` করার আসল অর্থ হলো, তার জীবনচক্র সম্পন্ন হতে বাধা দেওয়া। নদী সমুদ্র পর্যন্ত যেতে যে অসংখ্য লোকালয়, উদ্ভিদ, প্রাণীকে জীবন দিয়ে যায়, তা থেকে বঞ্চিত হওয়া। নদীর পানি সমুদ্রে পড়ে মিঠা ও লোনা পানির যে ভারসাম্য রক্ষা করে তা ধ্বংস করে প্রথমে উপকূলে ও পরে অন্যান্য অঞ্চলে লবণাক্ততা ছড়িয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের মতো একটা সক্রিয় বদ্বীপে এর তাৎপর্য আরো গভীর। নদীমাতৃক বাংলাদেশকে নদী শুধু জন্মই দেয়নি, এখনো জন্ম দিয়ে চলেছে। প্লাইসেটোসিন যুগে বঙ্গোপসাগর এখনকার চেয়ে ২০০ মাইল উত্তরে ছিল। সেখানে পলি জমে জমেই আজকের বাংলাদেশের ভূমি গঠিত হয়েছে। প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠের উচ্চতা ৫ থেকে ৭ মি.মি. করে বাড়ছে; কিন্তু এখানে উলম্বভাবে পলি জমার পরিমাণ তার চেয়ে বেশি বলেই বাংলাদেশ সমুদ্রে বিলীন না হয়ে বরং নতুন ভূমি লাভ করছে। কিন্তু নদীর ওপর অসংখ্য বাঁধ নির্মাণের ফলে ইতিমধ্যেই বঙ্গোপসাগরে নদীর পলি বহন করে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে বঙ্গোপসাগরে ২.৫ বিলিয়ন টন পলি জমত, তা ১৯৯১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১.২ বিলিয়ন টনে। বর্তমানে তা আরো কম। এর সঙ্গে আরো আরো বাঁধ ও নদী সংযোগ প্রকল্প যুক্ত হলে অবস্থা কোথায় দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমেয়। এখন যদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অধিক হারে বাড়াকে বিবেচনা করি, তাহলে বাংলাদেশের একটা বিরাট অংশ তলিয়ে যাওয়ার ও আরো একটা বড় অংশ লবণাক্ততার কারণে কৃষিকাজের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা সৃষ্টি হবে।

বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কিভাবে একটা নদীকে ধ্বংস করা হয়েছে ও কিভাবে তা প্রাণ-প্রকৃতি ও জনগণের জীবন ধ্বংস করছে তার আদর্শ উদাহরণ হতে পারে তিস্তা। তিস্তা নদীর উৎস যে সিকিমে, সেখানে চারটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে, সেখানে পানি জলাধারে জমা করে রাখা হচ্ছে। ফলে প্রতিটি জলাধার থেকে কমপক্ষে ৫ শতাংশ পানি বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যাচ্ছে, পানিকে পলি ও জৈব পদার্থমুক্ত করে তার স্বাভাবিক প্রাণকে নষ্ট করা হচ্ছে, বর্ষাকালীন প্রবাহ কমিয়ে ও স্বাভাবিক বাস্তু সংস্থান নষ্ট করে জমিকে পলি বঞ্চিত করা হচ্ছে, মাছের প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রতিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। এরপর তিস্তার সঙ্গে মহানন্দা ও মেচি নদীর সংযোগের মাধ্যমে পানি বিহারে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর গজলডোবায় ভারত পানি প্রত্যাহার করে সেচ প্রকল্প চালাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে তিস্তা এক ক্ষয়িষ্ণু ধারা হিসেবে প্রবাহিত হচ্ছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশে তিস্তা ব্যারেজ খাতে পানি টেনে নিয়ে যাওয়া যুক্ত হয়ে নদীর বেশির ভাগটাই শুকিয়ে প্রায় নালায় পরিণত হয়েছে। (চলবে)